টেংরাটিলা বিস্ফোরণে নাইকো মামলায় ৪২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ পাচ্ছে বাংলাদেশ
সুনামগঞ্জের ছাতকে অবস্থিত টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনায় দীর্ঘদিন পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ন্যায়বিচার পেল বাংলাদেশ। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সালিশি সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সেটেলমেন্ট অব ইনভেস্টমেন্ট ডিসপিউটস (ইকসিড) ট্রাইব্যুনাল এক যুগান্তকারী রায়ে কানাডিয়ান প্রতিষ্ঠান নাইকো রিসোর্সকে বাংলাদেশকে ৪২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। বর্তমান বিনিময় হারে যার পরিমাণ ৫০০ কোটি টাকারও বেশি।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজানুর রহমান গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল নাইকোর চরম অবহেলা ও কারিগরি অদক্ষতাকেই এই দুর্ঘটনার জন্য দায়ী করেছেন এবং সেই বিবেচনায় ক্ষতিপূরণ প্রদানের চূড়ান্ত আদেশ দিয়েছেন।
টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রটি প্রথম আবিষ্কৃত হয় ১৯৫৯ সালে। পরবর্তীতে ২০০৩ সালে এর অনুসন্ধান ও উন্নয়ন কার্যক্রমের দায়িত্ব পায় নাইকো রিসোর্স। তবে দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র দুই বছরের মধ্যেই, ২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি ও ২৪ জুন পরপর দুটি ভয়াবহ বিস্ফোরণে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে। নাইকোর প্রযুক্তিগত গাফিলতির কারণে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ডে বিপুল পরিমাণ গ্যাস পুড়ে যায়। পাশাপাশি আশপাশের গ্রামগুলোর ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, গাছপালা ও পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ঘটনার পর পেট্রোবাংলা ক্ষতিপূরণ হিসেবে নাইকোর কাছে ৭৪৬ কোটি টাকা দাবি করলেও প্রতিষ্ঠানটি তা পরিশোধে অস্বীকৃতি জানায়। একপর্যায়ে বিষয়টি আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে গড়ায়। দীর্ঘ শুনানি শেষে আদালত নাইকোর দায় প্রমাণিত হওয়ায় ক্ষতিপূরণের এই রায় দেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিস্ফোরণে মূলত টেংরাটিলা বা ছাতক পশ্চিম অংশের একটি স্তরের গ্যাস ক্ষতিগ্রস্ত হলেও গ্যাসক্ষেত্রের অন্যান্য স্তর এবং ছাতক পূর্ব অংশে এখনো উল্লেখযোগ্য গ্যাস মজুদ অক্ষত রয়েছে। ভূতাত্ত্বিকদের ধারণা অনুযায়ী, পুরো ক্ষেত্রজুড়ে প্রায় ২ থেকে ৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই রায় শুধু বাংলাদেশের জন্য আর্থিক ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করেনি, বরং ভবিষ্যতে বিদেশি কোম্পানিগুলোর দায়িত্বহীন কার্যক্রমের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ধরে ঝুলে থাকা এই মামলার রায়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষের মধ্যেও স্বস্তি ফিরে এসেছে।
পেট্রোবাংলা সূত্র জানিয়েছে, প্রাপ্ত ক্ষতিপূরণের অর্থ দিয়ে পরিবেশগত ক্ষতি মোকাবিলা, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পুনর্বাসন এবং নিরাপদভাবে অক্ষত গ্যাস স্তর থেকে উত্তোলনের জন্য নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে।
