জিয়াউর রহমান: স্বাধীনতার ঘোষক, রাষ্ট্রনায়ক ও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা
বাংলাদেশের ইতিহাসে যে কয়েকজন ব্যক্তিত্ব চিরকাল অমর হয়ে থাকবেন, জিয়াউর রহমান তাদের অন্যতম। একজন সৈনিক থেকে রাষ্ট্রপতি হয়ে ওঠা এই মানুষটি শুধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েই ক্ষান্ত হননি, তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠন করেছেন, বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ভিত্তি স্থাপন করেছেন। তার জীবন ছিল সাহস, দূরদর্শিতা, ত্যাগ ও অদম্য কর্মস্পৃহার এক অনন্য উদাহরণ। ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি জন্ম নেয়া এই মহানায়ক ১৯৮১ সালের ৩০ মে মাত্র ৪৫ বছর বয়সে শহীদ হন, কিন্তু তার রেখে যাওয়া ঐতিহ্য আজও বাংলাদেশের রাজনীতি ও উন্নয়নের মূল স্তম্ভ। এই রাজনৈতিক জীবনীতে আমরা তার জীবনের প্রতিটি অধ্যায়কে বিস্তারিতভাবে, অনুপ্রেরণামূলক ভাষায় তুলে ধরব।
প্রারম্ভিক জীবন ও সামরিক শিক্ষা: এক সৈনিকের উত্থান
জিয়াউর রহমান (ডাকনাম জিয়া) জন্মগ্রহণ করেন বগুড়া জেলার বাগবাড়ি গ্রামে। তার পিতা মনসুর রহমান ছিলেন একজন রসায়নবিদ, যিনি কলকাতায় সরকারি চাকরি করতেন। মা জাহানারা খাতুন। পরিবারের সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবেশে বেড়ে ওঠা জিয়া ছোটবেলা থেকেই শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ এবং দেশপ্রেমের গুণাবলীতে সমৃদ্ধ ছিলেন। তিনি বগুড়া জেলা স্কুলে পড়াশোনা করেন এবং পরবর্তীতে কলকাতা ও করাচিতে শিক্ষা সমাপ্ত করেন।
১৯৫৩ সালে তিনি পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন। ১৯৫৫ সালে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে কমিশন লাভ করেন। প্রথমে পাঞ্জাব রেজিমেন্টে যোগ দিলেও পরে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে স্থানান্তরিত হন। তিনি সামরিক গোয়েন্দা বিভাগেও কাজ করেন। তার সামরিক জীবন ছিল কর্মদক্ষতা ও সাহসিকতার প্রতীক। ১৯৬০-এর দশকে তিনি বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন এবং দ্রুত পদোন্নতি লাভ করেন।
জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিত্ব ছিল আকর্ষণীয়—শান্ত, চিন্তাশীল কিন্তু সংকটকালে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি খেলাধুলা, বিশেষ করে ফুটবল ও হকিতে পারদর্শী ছিলেন। তার এই সামরিক প্রশিক্ষণই পরবর্তীকালে স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়ার ভিত্তি হয়ে ওঠে।
১৯৭১: স্বাধীনতার ঘোষক ও মুক্তিযুদ্ধের বীর
১৯৭১ সালের মার্চ মাসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যা শুরু হলে জিয়াউর রহমান (তখন মেজর) চট্টগ্রামে ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক ছিলেন। ২৬ মার্চ রাতে তিনি কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন: “আমি, মেজর জিয়াউর রহমান, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অস্থায়ী প্রধান, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি...” (শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে)। এই ঘোষণা মুক্তিযুদ্ধের সূচনা করে এবং লক্ষ লক্ষ বাঙালিকে অনুপ্রাণিত করে।
তিনি মুক্তিবাহিনীর সেক্টর কমান্ডার হিসেবে ১ নম্বর সেক্টর এবং পরে জিয়া ফোর্সের নেতৃত্ব দেন। তার নেতৃত্বে বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মুক্তিযুদ্ধে তার অবদানের জন্য তাকে বীর উত্তম খেতাব দেয়া হয়। যুদ্ধের পর তিনি কর্নেল পদে উন্নীত হন এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭৫-১৯৭৭: রাজনৈতিক উত্থান ও ক্ষমতা গ্রহণ
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার পর দেশে অস্থিরতা দেখা দেয়। জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান নিযুক্ত হন। ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতা বিপ্লবে তিনি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেন। বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের অধীনে তিনি চিফ মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর হন এবং ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
এই সময় দেশ ছিল অর্থনৈতিক সংকট, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং সামরিক অস্থিরতায়। জিয়া দৃঢ় হাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেন। তিনি সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান চালান।
রাষ্ট্রপতিত্বকাল (১৯৭৭-১৯৮১): সংস্কার ও উন্নয়নের যুগ
জিয়াউর রহমানের শাসনকাল ছিল বাংলাদেশের পুনর্গঠনের স্বর্ণযুগ। তিনি ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন, যা কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ এবং গ্রামীণ উন্নয়নের উপর জোর দিয়েছিল।
অর্থনৈতিক সংস্কার ও উদারীকরণ
- সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি থেকে বাজারমুখী অর্থনীতিতে রূপান্তর।
- বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করা, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ।
- রেডিমেড গার্মেন্টস (আরএমজি) শিল্পের সূচনা (১৯৭৮)।
- মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমিক প্রেরণের ব্যবস্থা (বিএমইটি প্রতিষ্ঠা), যা রেমিট্যান্সের ভিত্তি স্থাপন করে।
- ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ পুনরায় চালু।
- খাল খনন কর্মসূচি এবং সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি।
রাজনৈতিক সংস্কার ও গণতন্ত্র
- বাকশাল (একদলীয় শাসন) বিলুপ্ত করে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা।
- ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা।
- সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে “বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ” প্রতিষ্ঠা, যা ধর্মীয় অনুভূতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সম্মান করে।
- সংবিধানের প্রস্তাবনায় “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” যোগ।
- প্রেস ফ্রিডম, বাকস্বাধীনতা পুনরুদ্ধার।
- স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ (গ্রাম সরকার)।
অন্যান্য অবদান
- সেনাবাহিনীকে আধুনিকায়ন (সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি)।
- আইনশৃঙ্খলা উন্নয়ন, পুলিশ বাহিনীকে শক্তিশালী করা।
- শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ।
- আঞ্চলিক সহযোগিতা (সার্কের ভিত্তি স্থাপন)।
- পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য রক্ষা—চীন, মধ্যপ্রাচ্য, পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন।
তিনি ১৯৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। তার নেতৃত্বে দেশ অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ায়।
ব্যক্তিগত জীবন ও পরিবার
১৯৬০ সালে খালেদা খানমের (বেগম খালেদা জিয়া) সাথে তার বিয়ে হয়। তাদের দুই পুত্র তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান (কোকো)। জিয়া সংসারপ্রিয় মানুষ ছিলেন, কিন্তু দেশের স্বার্থে সবসময় প্রস্তুত থাকতেন।
শাহাদত: ১৯৮১ সালের ৩০ মে
চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে স্থানীয় দলীয় নেতাদের মধ্যে সমন্বয় সাধনের জন্য গিয়ে তিনি কিছু বিদ্রোহী সামরিক কর্মকর্তার হাতে নিহত হন। তার শাহাদত দেশকে শোকে মাতিয়ে তোলে। তাকে চট্টগ্রামে সমাহিত করা হয়।
উত্তরাধিকার: এক অবিস্মরণীয় ঐতিহ্য
জিয়াউর রহমানকে অনেকে “শহীদ প্রেসিডেন্ট” বলে সম্বোধন করেন। তার অবদান:
- বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা।
- অর্থনৈতিক উদারীকরণের পথিকৃৎ।
- বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের রূপকার।
- গ্রামীণ উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তার প্রতীক।
সমালোচকরা তার শাসনকালে সামরিক প্রভাব, কিছু মানবাধিকার ইস্যু নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কিন্তু তার সমর্থকরা বিশ্বাস করেন, তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের পথে নিয়ে গেছেন। তার স্ত্রী খালেদা জিয়া পরবর্তীকালে দু’বার প্রধানমন্ত্রী হয়ে তার আদর্শকে এগিয়ে নেন।
জিয়াউর রহমানের জীবন শেখায় যে, একজন সৈনিক কীভাবে রাষ্ট্রনায়ক হয়ে উঠতে পারেন। তার দূরদর্শী নেতৃত্ব আজও বাংলাদেশের প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্পে অনুপ্রেরণা জোগায়। তিনি বলতেন, “বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াবে।” এবং তা সত্যি হয়েছে।
শহীদ জিয়াউর রহমানের আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। তার আদর্শ চিরকাল বেঁচে থাকুক।
জিয়াউর রহমানের অর্থনৈতিক নীতি
যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে আধুনিক বাংলাদেশের ভিত্তি স্থাপন
জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ইতিহাসে শুধু স্বাধীনতার ঘোষক বা রাষ্ট্রপতি হিসেবেই নয়, একজন দূরদর্শী অর্থনৈতিক সংস্কারক হিসেবেও চিরস্মরণীয়। ১৯৭৫ সালের পরবর্তী অস্থির সময়ে যখন দেশ “বাস্কেট কেস” হিসেবে পরিচিত ছিল, তখন তিনি সমাজতান্ত্রিক কেন্দ্রীভূত অর্থনীতি থেকে সরে এসে বাজারমুখী, বেসরকারি খাত-নির্ভর এবং উৎপাদনমুখী নীতি গ্রহণ করেন। তার ১৯ দফা কর্মসূচি, দুই বছরের পুনর্গঠন পরিকল্পনা (Two-Year Reconstruction Plan) এবং বাস্তববাদী সংস্কারগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করে আজকের রেডিমেড গার্মেন্টস (আরএমজি), রেমিট্যান্স এবং কৃষিভিত্তিক উন্নয়নের ভিত্তি স্থাপন করে। তার শাসনকালে (১৯৭৭-১৯৮১) জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক থেকে ইতিবাচক ধারায় ফিরে আসে, বিদেশি সাহায্যের ব্যবহার বৃদ্ধি পায় এবং দেশ আত্মনির্ভরশীলতার পথে অগ্রসর হয়।
পটভূমি: ধ্বংসস্তূপ থেকে উত্থানের চ্যালেঞ্জ
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অর্থনীতি ছিল বিধ্বস্ত। যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি, ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ, জাতীয়করণের ফলে শিল্পের উৎপাদনশীলতা হ্রাস এবং সমাজতান্ত্রিক নীতির কারণে বেসরকারি উদ্যোগের অভাব ছিল প্রকট। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর এই সংকট মোকাবিলায় বাস্তববাদী পথ বেছে নেন। তিনি সমাজতন্ত্রের নামে একমুখী রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে “সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিকে ইসলামী সামাজিক ন্যায়বিচারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ” করে বাজার অর্থনীতির দিকে ঝুঁকেন। তার লক্ষ্য ছিল স্বনির্ভরতা, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং উৎপাদন বৃদ্ধি।
১৯ দফা কর্মসূচি: অর্থনৈতিক মুক্তির রূপরেখা
জিয়াউর রহমানের অর্থনৈতিক নীতির মূল স্তম্ভ ছিল ১৯ দফা কর্মসূচি (১৯৭৭ সালে ঘোষিত)। এতে জোর দেয়া হয়:
- স্বনির্ভরতা ও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা।
- গ্রামীণ উন্নয়ন ও বিকেন্দ্রীকরণ।
- বেসরকারি খাতের প্রসার।
- জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ।
- দুর্নীতি দমন ও সামাজিক ন্যায়বিচার।
এই কর্মসূচি শুধু কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল করে। তিনি “উৎপাদনের রাজনীতি” প্রবর্তন করেন, যা পরবর্তীকালে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাফল্যের চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে।
কৃষি খাতে বিপ্লব: গ্রামমুখী অর্থনীতি
জিয়াউর রহমান কৃষিকে অর্থনীতির মূল ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করেন। তার নীতিগুলো:
- সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, সার ও উন্নত বীজের প্রাপ্যতা বৃদ্ধি।
- কৃষকদের ভর্তুকি প্রদান এবং কৃষি বিপণন ব্যবস্থার উন্নতি।
- বিখ্যাত “খাল খনন কর্মসূচি” — গ্রামীণ জনগণকে সম্পৃক্ত করে সেচ সুবিধা বাড়ানো।
- গ্রাম সরকার (Gram Sarkar) প্রতিষ্ঠা — গ্রাম পর্যায়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন।
এর ফলে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এবং দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি কমে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো হয়, যা পরবর্তীকালে খাদ্য নিরাপত্তায় সহায়ক হয়।
শিল্প ও বাণিজ্য উদারীকরণ: বেসরকারি খাতের উত্থান
জিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল অর্থনৈতিক উদারীকরণ:
- জাতীয়কৃত শিল্পের কিছু অংশ পূর্ব মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেয়া।
- বেসরকারি উদ্যোগকে উৎসাহিত করা এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ।
- ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ পুনরায় চালু (১৯৭৭)।
- বাণিজ্য উদারীকরণ এবং রপ্তানিমুখী নীতি।
এই নীতির ফলে দেশের শিল্প খাতে গতি ফিরে আসে। তিনি 작小 ও কুটির শিল্পের প্রসার ঘটান, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে।
রেডিমেড গার্মেন্টস (আরএমজি) শিল্পের সূচনা
জিয়াউর রহমানের দূরদর্শিতার অন্যতম প্রমাণ হলো আরএমজি শিল্পের ভিত্তি স্থাপন। ১৯৭৮ সালে মাল্টি-ফাইবার অ্যাগ্রিমেন্টের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ এ খাতে প্রবেশ করে। তিনি দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রশিক্ষণের জন্য যুবকদের পাঠান এবং ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি সুবিধা চালু করেন। আজ যে শিল্প দেশের রপ্তানির প্রায় ৮০% এবং জিডিপির বড় অংশ জোগায়, তার বীজ তিনিই বপন করেছিলেন। এটি লক্ষ লক্ষ নারীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে সমাজে পরিবর্তন এনেছে।
রেমিট্যান্সের ভিত্তি: মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমিক প্রেরণ
জিয়া মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করে বাংলাদেশি শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের দ্বার উন্মুক্ত করেন। ১৯৭৬ সালে ম্যানপাওয়ার মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা এবং বিএমইটি-এর মতো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এ প্রক্রিয়া সংগঠিত হয়। আজ রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে।
অন্যান্য উল্লেখযোগ্য নীতি ও সংস্কার
- দুই বছরের পুনর্গঠন পরিকল্পনা: যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ, গ্রামীণ অর্থনীতির পুনরুজ্জীবন।
- বিদেশি সাহায্যের সর্বোচ্চ ব্যবহার: সাহায্য ব্যবহারের হার ১৭% থেকে ৮৬% এ উন্নীত।
- জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও নারী উন্নয়ন: পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি।
- পররাষ্ট্রনীতির সাথে অর্থনৈতিক সমন্বয়: চীন, মধ্যপ্রাচ্য, পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি করে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি।
- আইনশৃঙ্খলা ও দুর্নীতি দমন: স্থিতিশীলতা ছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয় বলে তিনি বিশ্বাস করতেন।
প্রভাব ও উত্তরাধিকার
জিয়াউর রহমানের অর্থনৈতিক নীতির ফলে দেশ “বাস্কেট কেস” থেকে “সাকসেস কেস”-এ রূপান্তরিত হয়। জিডিপি প্রবৃদ্ধি -১.৭% থেকে ৪.৫% এ উন্নীত হয়। তার নীতিগুলো পরবর্তীকালে খালেদা জিয়ার শাসনামলে আরও বিস্তার লাভ করে। সমালোচকরা সামরিক প্রভাব বা কিছু সীমাবদ্ধতার কথা বললেও, তার দূরদর্শিতা আজও অস্বীকার করা যায় না। আরএমজি, রেমিট্যান্স এবং কৃষির ত্রিমুখী ভিত্তি তারই অবদান।
জিয়াউর রহমানের অর্থনৈতিক দর্শন ছিল সাধারণ মানুষকেন্দ্রিক — গ্রাম থেকে শহর, কৃষক থেকে শ্রমিক, সকলকে উৎপাদনে সম্পৃক্ত করা। তিনি বলতেন, “বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াবে।” তার এই স্বপ্ন আজ বাস্তবে পরিণত হয়েছে। তার আদর্শ ও নীতি আজও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অনুপ্রেরণা।
শহীদ জিয়াউর রহমানের অবদান চিরকাল বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
